রিকশাওয়ালার প্রেম
আমি ক্লাসে ঢুকতেই সবাই মিলে একসাথে বলতে শুরু করলো
>এই দেখ দেখ আমাদের রিকশাওয়ালা এসেছে
>কি মামা যাবা নাকি
>সালা দিনমজুর
>ক্ষ্যাত কোথাকার
>এই শ্রমিক আজ কত কামাইছিস
কথাগুলো খুব হাসি তামাশা করে বলতে থাকলো। আমি ছলছল চোখ নিয়ে সবার দিকে একবার চোখ বুলিয়ে মাথা নিচু করে শেষ বেঞ্চে বসে পড়লাম। বুকের ভেতর টা খুব যন্ত্রণা অনুভব করছে। ভাবছি এই ধনীর দুলাল দুলালি রা কি পড়াশোনা শিখছে?? হতে পারি দিনমজুর তাই বলে কি কোন মুল্য নেই সমাজে আমার?? আমার মত আরো হাজারো দিনমজুর আছে। তাদের কেও এরা কি মুল্য দিচ্ছে? লজ্জা পাইনি কিন্তু কষ্ট হচ্ছে কথাগুলো শুনে। শুধু বারবার একটা কথাই বলতে ইচ্ছে করছে
"" আমার জায়গায় একবার নিজেদের বসিয়ে দেখো জীবন কতটা কঠিন ""
সবার ওই খোচানি কথাগুলো কানে বাজছে। দু এক ফোটা জল গড়িয়ে পড়লো বইয়ের ওপর। নাফিসা খুব হাসি হাসছে আমাকে এভাবে সবার কাছে তুলে ধরতে পেরে। কিন্তু কারো ওপর রাগ হচ্ছে না। ওরা আমারই বন্ধু। একই ক্লাসে পড়ি। হটাত সবাইকে থামিয়ে দিলো জেরিন।
>আশ্চর্য কি শুরু করছিস সবাই?? একটা মানুষকে এভাবে কেন অপমান করছিস??
>উলে বাবালে দেখ দেখ মাদার তেরেসার নাতনী কি বলে?? তোর খুব কষ্ট হচ্ছে নাকি রে??
>কেন হবে না বল?? সেও তো আমাদের ই একজন নাকি?? তাহলে এত খারাপ ইম্প্রেশন কেন ওর জন্য?? ও রিকশাচালায় এজন্য কি ও মানুষ না?? ওকে নিয়ে আর কেউ একটা কথাও বলবি না খবরদার
নাফিসা তুই নিজেকে যতটা জমিদার ভাবিস আসলে তোর পরিবার কেমন তা আমার থেকে ভালো কেউ জানে না। আর কখনো আমার সামনে কাওকে কিছু বলার আগে দশবার ভাববি আর নিজের পজিশনটাও ভেবে নিবি। আর বাকি যারা আছো তোমরা মানুষকে মুল্যায়ন করতে শিখো। কাওকে অপমান করার আগে ভেবে দেখো সেই অপমান তোমাদের করলে কতটা কষ্ট লাগতে পারে।
জেরিনের এমন কথা শুনে সবাই চুপ হয়ে গেলো। এবং আরো দু একজন তাকে সাপোর্ট করলো। কিন্তু মন থেকে অনেকেই মানতে রাজি হলো না। এরই মধ্যে ক্লাস টিচার চলে এলে সবাই যার যার জায়গায় বসে পড়লো।
ক্লাস শেষ হলে জেরিন আমার দিকে এগিয়ে আসছে আমি ক্লাস থেকে বের হতে লাগলাম।
>জাইন এই জাইন
>জি, আপনি আমার নাম জানলেন কি করে
>প্রেজেন্টের সময় জেনেছি
>ওহহ কিছু বলবেন
>সবার পক্ষ থেকে আমি সরি বলছি। ওরা যা করেছে তা মোটেও ঠিক হয়নি।
>আপনি কেন সরি বলছেন?? আর আমি কিছু মনে করিনি। যেটা বলেছে সেটা তো মিথ্যে নয়
>মিথ্যা না হলেও সবার একটা আত্মমর্যাদা আছে। কোন কাজই ছোট করে দেখা উচিত নয়। আর যারা এসবকে ছোট করে দেখে তারা কোন ভাবে সমাজে থাকার যোগ্য না।
>থাক বাদ দেন এসব। আমি যাই এখন।
>কি বেপার তুমি আমাকে আপনি করে বলছো কেন
তুমি করে বলবা
>না না এটা মানায় না আমার সাথে
>খুব মানায় আমরা তো বন্ধু তাইনা আর আপনি নয় তুমি করে বলবা
.......................
>কি হলো চুপ করে আছো কেন। আচ্ছা আমি তোমার ভালো একটা বন্ধু হবো বন্ধু হবে তো আমার??
আমি বস্তিতে থাকা একটা ছেলে যে কখনো ভালো একটা জামা পরিনি তারওপর দিনমজুর। এমন ছেলের সাথে কথা বলতেই ঘৃনা করে আর এই মেয়ে বন্ধু হতে চাচ্ছে??? সত্যি আমি অবাক হয়ে গেলাম জেরিনের এমন আচরনে। ভাবলাম মেয়েটার মাঝে আসল শিক্ষা আছে। কিন্তু বিষটা কেমন জানি লাগছে তাই তখনই রাজি না হয়ে বললাম পরে জানাবো।
জেরিনের থেকে বিদায় নিয়ে চলে এলাম রিকশা নিতে। সারাটাবিকেল যা ইনকাম হবে তা দিয়ে ই দুজন মানুষ খেতে পারব। আমি কখনো আদপেটা বা না খেয়ে ও আমার ছোট বোনটাকে খাইয়েছি। তাই জলদি এসে রিকশা নিয়ে বের হলাম। এখন কলেজ ছুটি হওয়াতে সবাই বের হয়েছে। মুখটা ঢেকে নিয়ে গেটের সামনে দাড়ালাম। ঘন্টা খানেক পর আবার এসে ওখানে এলাম। দেখি আমাদেরই এক স্যার মাহিম স্যার রিকশার জন্য অপেক্ষা করছে। আমি একটু এগিয়ে গিয়ে বললাম
>স্যার কোথায় যাবেন উঠুন
>এইতো ১০ নাম্বার যাবো
>উঠে পড়ুন স্যার
>তুমি এত অল্প বয়সে লেখাপড়া না করে রিকশা চালাও তোমার বাবা কি করেন
>আমি এতিম স্যার
>ওহহ আচ্ছা
>আর আমি পড়াশোনা ও করি
>যাক ভালো তো। কোথায় পড়ো
>আপনারই কলেজে
>কি বলো তুমি
>জি স্যার আমি জাইন। প্রথম বর্ষের ছাত্র। বিজ্ঞান বিভাগের। গতকাল আপনি ক্লাসে যার পড়া নিয়েছিলেন।
>oh my god. তোমার মেধা আছে অনেক কিন্ত তোমার এমন অবস্থা দেখে সত্যি খুব খারাপ লাগলো। তবে আমি কথা দিচ্ছি তোমার জন্য কিছু একটা করব।
স্যার সবকিছু জেনে নিলেন আমার বেপারে। আর নামার সময় একটু বাড়িয়ে টাকা দিলেন। আমি জোর করে ও ফিরাতে পারলাম না। হাতে টাকা গুজে দিয়ে আর একটা কোল্ডড্রিংকস দিয়ে বললেন সাবধানে কাজ করবে।
সন্ধ্যা হয়ে গেছে। এখন আমাকে ফিরতে হবে। রিকশা জমা দিয়ে আর দিনের ভাড়াটা দিয়ে বাকিটাকা নিয়ে চাল ডাল কিনে বোনের জন্য কিছু চকলেট নিয়ে কুড়েঘরে ফিরলাম। গিয়ে দেখি বোনটা আমার ঘুমিয়ে আছে।
>ফাতেমা,, আপু,,, দেখ তোর ভাই এসেছে তোর জন্য কত চকলেট আনছে। খাবি না??
বোন আমার চোখ খুলে চকলেট আর আমাকে দেখে হাসি মুখে আমার কোলে এসে জড়িয়ে ধরে বললো
>তুমি আমাল ভালো ভাইয়াটা। তকলেত কাবো
আমি একটা চকলেট খুলে ওর মুখে দিলাম। ও খুশি মনে খাচ্ছে। আর আমার জামা খুলে রাখতে জামা ধরে টানছে। হয়তো বুঝতে পারে ভাই কষ্ট করে এসেছে একটু কাজ করে এগিয়ে দিলে ভাই এর কষ্ট কমবে।
এটাই তো ভাই বোনের ভালোবাসা।
ওকে বসিয়ে রেখে চুলোয় ভাত রান্না করতে শুরু করলাম। পাশাপাশি বই নিয়ে বসে পড়া গুলো দেখছি। প্রতিদিনের পড়াগুলো না করলে ভালো রেজাল্ট করতে পারব না। যত কষ্ট ই হোক না কেন পড়াশোনা করতেই হবে আমাকে। একদিন আমিও দশজনের একজন হবো। আমার বোনটাকে সুন্দর জামা কিনে দিব। রেস্টুরেন্টে বসে সাহেবদের মত খাব। পেটভরে একটু ভালো খাবার খেতে পারব। আল্লাহ হয়তো আলোর মুখ দেখাবেন একদিন।
ভাত রান্না হয়ে গেছে। বোনটা আমার খাবে বলে কান্না শুরু করেছে। ছোট মানুষ তো সহ্য করতে পারে না হয়তো তার ভাইএর মত। জলদি খাবার খাইয়ে দিয়ে ওকে ঘুম পাড়িয়ে দিলাম। তারপর নিজে খেলাম। বোনকে বুকে জড়িয়ে রাতের ঘুমে অচেতন হয়ে গেলাম।
পরদিন ক্লাসে গেলাম। জেরিন দ্বিতীয় বেঞ্চে বসে আছে দেখলাম। চুপ করে পাশ দিয়ে পেছনে যেতে লাগলাম তখন জেরিন আমার হাত ধরে ওর পাশে রাখা সিটে আমাকে বসিয়ে দিলো। এই প্রথম কোন এক মেয়ের হাতের ছোয়া লাগলো। কেমন জানি কেপে উঠলাম একরকম। তাও যে সে মেয়ে নয়। কোন এক বাবার আদুরে রাজকন্যা। চুপ করে আছি দেখে জেরিন নিজেই বললো
>কি হলো কথা বলো না কেন হুমম
>এমনি।
>আজ তোমার সবকিছু আমাকে বলবে?? আমি সবকিছু শুনতে চাই। কি বলবে তো??
আমাদের কথা বলা দেখে বাকিরা সব খারাপ নজরে তাকাচ্ছে। বিশেষ করে নাফিসা। কোনভাবেই আমাকে সহ্য করতে পারছে না। কি জানি ওর কি ক্ষতি করে ফেলছি।
আজ মাহিম স্যারের ক্লাস আছে। স্যার ক্লাসে এসেই আমাকে দেখে জিজ্ঞেস করলো কেমন আছি
সবার উদ্দেশ্য বললেন
>আজ তোমাদের একজন সংগ্রামি মানুষের গল্প বলব শুনবে সবাই??
>জি স্যার শুনব................
#চলবে........😉😉
Comments
Post a Comment