আহারে বউ_বদল

#বউ_বদল#
************
আমি যখন ক্লাশ নাইনে উঠেছি, তখন আমি অগ্রণী বালিকা বিদ্যালয়ে ভর্তি হলাম। মফস্বলের
পুরাতন স্কুল ছেড়ে সবেমাত্র ঢাকার নুতন স্কুলে
ভর্তি হয়েছি। ঢাকার স্কুল, কলেজের মেয়েরা বেশির ভাগ স্মার্ট, সুদর্শনা হয়। কিন্তু সবার মনটা আবার
সুন্দর হয় না। স্কুলে ভর্তি হয়ে প্রথম প্রথম মনের 
মতো কাউকে না পাওয়াতে মনটা খুব খারাপ থাকতো।
মফস্বলের পুরাতন সব বান্ধবীদের ছেড়ে এসেছি। ঢাকার স্কুলে সম্পুর্ন নুতন একটা পরিবেশ। ঠিক সেই সময়টিতে খুব সুন্দর মনের অধিকারী একজন বন্ধু 
পেলাম, নাম বুশরা। সে আমাকে প্রতিটি বিষয়ে
সহযোগিতা করতে লাগলো। বুশরার চার বোন। ও সবার বড়ো কিন্তু দেখতে আহামরি কোন সুন্দর নয়। 
গায়ের রংটা শ্যামলা। আর তার চুলের কথা  সাহিত্যের ভাষায় বলতে গেলে  বলা যায়,, মেঘবরণ চুল। তার  চুল
এতো কালো,লম্বা,  আর সিল্কি ছিলো যে অনেক সময় 
"ঠাকুরমার ঝুলি" গল্পের "কেশবতী কন্যার মতো আমরাও দুষ্টুমি করে বলতাম , **কেশবতী কন্যা, কেশবতী কন্যা, নামাও তো তোমার কেশ **।
 তার মতো একজন বন্ধু এ স্কুলে পাবার পর, এ স্কুলের প্রতি আমার ভালোবাসা শতগুণে বৃদ্ধি পেলো। বুশরার পরের বোনটির নাম অপ্সরা। সে বুশরার চেয়ে একবছরের ছোট। সে পড়ে ক্লাস এইটে।  অপ্সরা দেখতে পরীর মতো সুন্দর হলেও তাকে কখনো আমার আন্তরিক মনে হয়নি। তাই অপ্সরাকে কখনো আমার ভালো লাগেনি। আমি স্কুল জীবনে বুশরাদের বাসায় বেশ কয়েকবার গিয়েছি,  যতবারই গিয়েছি ততবারই দেখেছি,  তাদের বাসাটি খুব সুন্দর পরিপাটি করে গোছানো। বুশরাদের পরিবারটা ছিলো আর্থিকভাবে স্বচ্ছল। তবে খুব ধনী বলা যাবে না। ওর আম্মুর হাতের রান্না ছিলো অনেক  মজাদার । 
:
বুশরা ওর আম্মুর সব কাজে সহযোগিতা করতো।  ওর আম্মু, ওর সব বোনদের জামা কাপড় নিজেই সেলাই করে দিতেন।  তিনি সূচীকর্মে ও অনেক নিপুণা ছিলেন।  বুশরা, তার আম্মুর সব কাজে সহযোগিতা করায়, সেও তার আম্মুর মতো  সব কাজে  সমান পারদর্শী হয়ে উঠলো। 
:
আমি আর বুশরা স্কুলের গন্ডি পেরিয়ে,  দুজন একসাথে
বদরুন্নেছা কলেজে পড়াশুনা  করেছি। কিন্তু কলেজের
পর দুজনের গন্তব্য দু'দিকে চলে গেলো। বুশরা ভর্তি 
হলো **হোম ইকোনোমিক্স কলেজে** আর আমি 
ভর্তি হলাম **ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে**। ওর মতো বান্ধবীকে বিশ্ববিদ্যালয় জীবনে না পেয়ে, মনটা অনেক খারাপ হয়ে গেলো। বুশরা সুযোগ পেলেই আমার ডিপার্টমেন্টে বেড়াতে আসতো। তখন আমি বুশরাকে কলাভবনের কোনার দিকের দোকান  *ক্যাম্পাস সেডো* তে পোলাও, মাংস, ডিম ভুনা আর লেবুর শরবত খাওয়াতাম।  কারণ  খাবারগুলি  দামের তুলনায় ছিলো অনেক বেশি আকর্ষণীয়।
বিশ্ববিদ্যালয়ের সব  বান্ধবীদের চেয়ে ও  বুশরা ছিলো আমার অনেক বেশী প্রিয়। 
:
প্রথম বর্ষ ফাইনাল পরীক্ষা শেষ হবার পর, একদিন 
বুশরা হঠাৎ করেই তার বোন অপ্সরার বিয়ে ঠিক হয়ে 
গেছে বলে  আমাকে জানায়। বুশরার আগে অপ্সরার বিয়ে হবে,  বিষয়টি শুনে আমি অত্যন্ত মর্মাহত হয়েছি। আসলে বুশরার চেয়ে অপ্সরা অনেক বেশি সুন্দর হওয়ায়, পাত্রপক্ষ অপ্সরাকেই বেশি পছন্দ করেছে।পাত্রের নাম অর্নব। সে  অনেক শিক্ষিত,ভদ্র, দেখতে 
 অনেক হ্যান্ডসাম আর ওরা অনেক বড়লোক।  তাদের বাসা গুলশান। যে কোনো কন্যাদায়গ্রস্ত পিতার জন্য  এরকম পাত্র পাওয়া পরম সৌভাগ্যের। 
:
অর্নবের প্রথম দেখাতেই অপ্সরাকে পছন্দ হয়ে যায়। পছন্দ হবার পর পরই বিয়ের দিনক্ষণ ও নির্ধারণ হয়ে যায়। বুশরার আগে অপ্সরার বিয়ের বিষয়টি ওদের 
পরিবারের সবাই খুব সহজেই মেনে নিয়েছে। বুশরাও
তা সহজেই মেনে নিয়েছে।  অপ্সরার এ রকম ভাগ্য 
সুপ্রসন্ন দেখে বুশরার বাবা- মা, আত্মীয় স্বজন,  সবাই খুব খুশি। আমার খুব কষ্ট হচ্ছিল আমার বন্ধু বুশরার 
জন্য। আর ওর বাবা-মায়ের প্রতি রাগ হচ্ছিল, কোনো 
তারা বুশরার মতো এতো সুন্দর মনের একজন 
মেয়ের কথা না ভেবে, ওর ছোট বোনের বিয়ের ব্যাপারে
এতোটা উদগ্রীব সে কারনে  । বুশরার বোনের বিয়ের সব আনুষ্ঠানিকতার ব্যাপারে বুশরা, আমাকেও সহযোগিতা করতে  বলেছিলো। তাই আমি প্রথম থেকে  বিয়ের সব অনুষ্ঠানে এটেন্ড করেছি।
:
বুশরা তার বোনের বিয়ের আনুষ্ঠানিকতার ব্যাপারে একটা  প্ল্যান তৈরি করলো। হলুদের অনুষ্ঠানে কিভাবে 
স্টেজ সাজানো হবে ? হলুদের খাবারের মেনু কি হবে?কোন পার্লার থেকে সবাই সাজবে? হলুদ আর বিয়েতে সবাই কি রকম ড্রেস পরবে?? বিয়েতে খাবার মেনু কি হবে,ইত্যাদি ইত্যাদি।।
:
হলুদের দিন থেকে শুরু করে  বিয়ের দিন পর্যন্ত বুশরাদের বাসায়, তাদের আত্মীয় স্বজন এসে ঘর ভরে গেলো। বরপক্ষের  বাড়ি  থেকে মেয়েকে বিয়েতে সাজানোর সমস্ত জিনিসপত্র যেমন ঃ সোনার গহনা, শাড়ী ইত্যাদি,  এসব চলে এসেছে।  অপ্সরার বান্ধবীরা সবাই মিলে তাকে বাসাতেই  সাজানোর প্ল্যান করেছিলো।  বিয়ে শুরু হবার তিন ঘন্টা আগে অপ্সরার বান্ধবীরা  এসে জানালো,  অপ্সরাকে  বাসায় খুঁজে পাচ্ছে  না। ঐ সময় আমিও বুশরাদের  বাসায় উপস্থিত ছিলাম।  অপ্সরার বান্ধবীদের একথা শুনে আমরা সবাই চমকে উঠলাম। তিন ঘন্টা পর বরপক্ষ এসে পড়বে আর এ সময় অপ্সরাকে খুঁজে পাচ্ছে না, তা কি করে সম্ভব?? অপ্সরা কোথায়..বিষয়টি কেউ বুঝতে পারছিলো না। অপ্সরার সাথে কারো কোনো সম্পর্ক আছে কিনা, এ ব্যাপারে তাদের বাসায় কেউ  জানতো না। অপ্সরা কোথায় গেলো??  এ কথা ভাবতেই তার 
বাবা-মায়ের মাথায় যেনো আকাশ ভেঙে পড়লো।
অপ্সরাকে সম্ভাব্য সব জায়গায় খোঁজা হলো কিন্তু 
কোথাও পাওয়া গেলো না। এ থেকে সবাই স্পষ্ট বুঝে
গেলো, অপ্সরার নিশ্চয়ই কোনো প্রেমিক আছে, যার 
হাত ধরে সে পালিয়েছে,  আর এ বিষয়টি তাদের 
বাসার  সবার অজানা। কিন্তু একথা জানাজানি হলে 
এ বাড়ির  আর মানসম্মান থাকবে না। তাই তারা এখন কি করবে, বাড়ির সবাই যেনো দিশেহারা হয়ে পড়লো। অপ্সরার চাচা-মামারা মিলে তার একটা উপায় বের করতে লাগলো। হঠাৎ করেই তারা ডিসিশন নিলো অপ্সরার জায়গায় তারা বুশরাকে বিয়ের কনে হিসেবে বসিয়ে দিবে। তারপর যা হবার হবে। কারণ  এ বাড়ির মান সন্মান বাঁচানোর জন্য এ ছাড়া আর অন্য কোনো উপায় তাদের জানা নেই। বুশরার বাবাও তাদের আপন আত্মীয়দের পরামর্শে এ প্রস্তাবে রাজি হয়ে গেলো। কারণ এতো ভালো পাত্র, তারা কিছুতেই হাতছাড়া করতে রাজি নয়। 
:
বুশরার বাবা আর তার আপন আত্মীয়দের এরকম 
অন্যায় সম্মতিতে বুশরা যেনো অনেকটা  দিশেহারা 
হয়ে গেলো। কি করবে সে বুঝে উঠতে পারছিলো না। 
কিন্তু সবার চাপাচাপিতে, উপায়ান্তর না দেখে সে 
কনে সেজে বসে রইলো। 
:
বুশরা  আজ অপ্সরার জন্য বরপক্ষের বাড়ি থেকে পাঠানো মেজেন্টা কালারের বেনারসি শাড়ি, ভারী
সোনার গহনা পরে , বউ সেজে বসে রইলো। কিছুক্ষনের মধ্যেই বরপক্ষ চলে আসবে। বুশরার মনে এক অজানা আশংকা বিরাজ করতে লাগলো। তার ভিতর এক অসহ্য যন্ত্রণা হতে লাগলো। সে তখন কিছুই ভাবতে 
পারছিলো না। তার হঠাৎ মনে হতে লাগলো, সে মাথা ঘুরে পরে যাবে। কিন্তু  সে নিজেকে যথেষ্ট স্থির রাখলো। আমি পাশে থেকে তাকে আশ্বাস দিলাম, ধৈর্য ধরার জন্য, আর বললাম সব ঠিক হয়ে যাবে। তারপর সে নিজেকে যথেষ্ট সামলে স্থির হয়ে বসে রইলো। সবাই হঠাৎ চিৎকার করতে লাগলো,, বর এসেছে বলে।
:
বরকে তাজা ফুলের মালা দিয়ে বরন করা হলো। আর শরবত, মিষ্টি  এগুলোও খাওয়ানো  হলো।  পাত্রপক্ষের সবাই কনে দেখার জন্য ঘরে প্রবেশ করলো। পাত্রপক্ষ এসে বুশরাকে দেখে প্রথমেই বললো, কনে পাল্টানো হয়েছে, একথা বলে  হৈচৈ শুরু করে দিলো। বুশরাদের পরিবারের  কেহই এ ব্যাপারে বিশেষ পাত্তা দিলো না।   বুশরার আত্মীয়রা সবাই বললো, কনে ঠিকই আছে। তারপর ওরা বিয়ের আনুষ্ঠানিকতা শুরু করে দিলো।  বরপক্ষ,  কনেপক্ষের চাপের মুখে পড়ে বুশরার সাথে অর্নবের বিয়ের কাজটি সুসম্পন্ন করলো। 
:
নানা ঝামেলা পার করে বুশরার সাথে অর্নবের বিয়েটা
সম্পন্ন হলো। আজকে অপ্সরার জায়গায় অর্নবের বউ
হলো বুশরা।  বুশরা মনে মনে খুব ভয় পেতে লাগলো,,
তার প্রতি কি ধরনের ক্ষোভ না জানি জমে আছে তার শ্বশুরের পরিবারে। আর ক্ষোভ জমলেই বা কি, যা হবার তাতো হয়েই গেছে। সে - তো নিজের থেকে কখনো এরকম চায়নি। অর্নবের জন্য বুশরার সত্যি সত্যিই খুব খারাপ লাগছিলো কারণ বুশরা কখনো চায়নি তাদের বিয়েটা এভাবে হোক।  বুশরাকে কখনো তার গায়ের রং বা চেহারা নিয়ে  মন খারাপ করতে দেখিনি।  সে সব সময় চেয়েছে, নিজেকে পারফেক্ট হিসেবে গড়ে তুলতে। বিয়ে নিয়ে তার মনেও একটা সুন্দর স্বপ্ন ছিলো। 
:
কিন্তু আজকে তার চোখের সামনে  যে ঘটনা ঘটে গেলো, তার জন্য সে কোনো ভাবেই প্রস্তুত ছিলো না।
নিজের অজান্তেই তার বুকের ভিতরটা হু হু করে উঠলো আর তার চোখ দিয়ে যেনো এক দুঃখের নদী  
প্রবাহিত হলো। আশে পাশের সবাই বলাবলি করছিলো,বুশরার ভাগ্য তো অপ্সরা খুলে দিয়ে গেলো।
তা না হলে বুশরা এমন ছেলে বিয়ে করতে পারে। এসব 
কথা শোনার পর বুশরার মনটা আরো খারাপ হয়ে গেলো। ভাগ্যের কাছে সে এভাবে হেরে যাবে, তা বুঝতে 
পারেনি। 
:
বিয়ে সম্পন্ন হবার পর, এবার কনে বিদায় দেবার পালা।
বুশরার বাবা- মা, বুশরাকে অর্নবের হাতে  তুলে দিলো।
অর্নবের হাতে তুলে দেবার সময় ও বুশরা, অর্নবের দিকে চোখ তুলে তাকানোর সাহস  পায়নি।  অর্নবের 
হাতে তুলে দেবার কিছুক্ষন পরেই বুশরাকে সবাই অর্নবদের বাসায় যাওয়ার জন্য গাড়িতে তুলে দিলো। 
বুশরা, তার বাবার বাড়ি থেকে শ্বশুর বাড়ি যাচ্ছে, অন্য 
মেয়েদের মতো কোনো সুখস্বপ্ন এঁকে নয়। মনে হয়,তার 
হাজারটা সুখস্বপ্ন ভেঙে তারপর যাচ্ছে। ভাগ্যের পরিহাস  যে  এতো নির্মম হবে, তা ভেবে বুশরার
হৃদয়টা  ক্ষতবিক্ষত  হতে লাগলো। 
:
বাবার বাড়ি থেকে তিন ঘন্টার পথ পেরিয়ে বুশরা, তার 
শ্বশুরবাড়ি গুলশান পৌঁছালো। তাকে দেখে তার  শ্বশুরবাড়ির সবাই কানাকানি করতে লাগলো, অর্নবের মতো এতো সুন্দর ছেলের জন্য বউটা ঠিক  মানানসই নয়। মেয়ে দেখার সময় সবার চোখ কোথায় ছিলো?? অর্নবের সাথে এই মেয়েকেতো একেবারে মানাচ্ছে না। অর্নবের এমন সর্বনাশ কে করলো??
:
এসব কথা শুনতে শুনতে বুশরার মনটা একেবারে ভেঙে গেলো। কোনো রকমে সবাই তাকে অর্নবের  ঘরে দিয়ে আসলো। বুশরা ঘরে গিয়ে দেখলো, ঘরটা খুব সুন্দর করে রজনীগন্ধা আর গোলাপ ফুল 
দিয়ে সাজানো। চারিদিকে ফুলের সৌরভে মাতোয়ারা
হয়ে আছে। ঘরের নিভু নিভু আলোতে বুশরা  অনেকক্ষন বসে রইলো। বুশরার কেবলই মনে হতে  লাগলো, অন্য সব মেয়েরা এ সময় স্বামীর অপেক্ষায়
থাকে আর সে বসে আছে এক অনিশ্চিত ভবিষ্যতের
অপেক্ষায়। 

চলবে..................... 

#################################

Comments